:

পাহাড়সম প্রত্যাশা বনাম কঠিন চ্যালেঞ্জ: নতুন বাংলাদেশ গড়ার অগ্নিপরীক্ষা

top-news

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর বিএনপি  চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হতে যাচ্ছে নতুন সরকার। তবে এই বিজয়ের আনন্দ ছাপিয়ে এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশজুড়ে মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতে, তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিগত দেড় দশকের ক্ষত সারিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া জটিল সমীকরণ মেলানো।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং আল জাজিরা'র বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি, তারা চেয়েছে ‘গুণগত পরিবর্তন’। নতুন সরকারের সামনে তাই অপেক্ষা করছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ।

 ১. সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’

জনগণের প্রধান দাবি হলো সর্বস্তরে ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করা। দেশের প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সেবা পেতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যে ভোগান্তির শিকার হয়, তার অবসান চায় জনগণ।

চ্যালেঞ্জ: প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রত্যাশা: তারেক রহমান ইতিমধ্যে দলীয় ফোরামে বার্তা দিয়েছেন যে, দুর্নীতিবাজ যেই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণ চায়, এই হুঁশিয়ারি কেবল কথায় নয়, কাজেও প্রতিফলিত হোক।

 ২. বাজার সিন্ডিকেট ও অর্থনৈতিক সংস্কার

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস সাধারণ মানুষের। *বিবিসি বাংলা*র এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বাজার সিন্ডিকেট’ একটি অদৃশ্য শক্তি।

চ্যালেঞ্জ: চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
প্রত্যাশা:  নতুন সরকারকে প্রথম দিন থেকেই বাজার মনিটরিংয়ে কঠোর হতে হবে। একইসঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বেকারত্বের অভিশাপ মোচনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

৩. আইন-শৃঙ্খলা: চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বা সরকার গঠনের শুরুতে চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং টেন্ডারবাজির আশঙ্কা থাকে। জনগণ এবার এসবের স্থায়ী অবসান চায়।

দখলবাজি রোধ:  ফুটপাত থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান—কোথাও যেন কোনো দলীয় বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দখলদারিত্ব চালাতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি।
সাঁড়াশি অভিযান: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও তাকিয়ে আছে, নতুন সরকার সন্ত্রাসীদের দমনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যারা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান বা ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনার দাবি জোরালো হচ্ছে।

 ৪. মুক্তিযুদ্ধ, মাজার ও সংস্কৃতির সুরক্ষা


সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ওপর আঘাত এসেছে। বিশেষ করে মাজার ভাঙচুর, স্মৃতিসৌধ অবমাননা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে কটূক্তির ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষকে ব্যথিত করেছে।

অবস্থান: যারা বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অস্বীকার করে, জাতীয় বীরদের অপমান করে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে মাজার বা ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে—তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা নতুন সরকারের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব।
মুক্তবুদ্ধির চর্চা:  ভিন্নমত দমনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তবুদ্ধি ও শিল্প-সাহিত্যের চর্চা অবারিত করা। সরকারবিরোধী মতকেও শ্রদ্ধার সাথে দেখার সংস্কৃতি চালু করা।

 ৫. অন্তর্বর্তী সরকারের ‘গোপন চুক্তি’ ও ছাত্র আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস


রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন রয়েছে, বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে কিছু ‘গোপন চুক্তি’ বা সমঝোতা স্মারক সই করেছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।

চ্যালেঞ্জ ও দাবি:  এই চুক্তিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা (শ্বেতপত্র প্রকাশ) এবং প্রয়োজনে তা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করা। এটি সরকারের স্বচ্ছতার প্রথম পরীক্ষা।
ছাত্র আন্দোলন: ছাত্র আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস এবং সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা জরুরি। আন্দোলনের নামে যারা নাশকতা করেছে তাদের থেকে প্রকৃত আন্দোলনকারীদের আলাদা করে সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা।

৬. আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি ও বিনিয়োগ

দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নতুন সরকারকে পশ্চিমারা এবং ভারত উভয়েই সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 বিনিয়োগ আনতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ‘রুল অব ল’ (আইনের শাসন) নিশ্চিত করতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখা হবে তারেক রহমানের জন্য বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।

নতুন সরকার, নতুন আশা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার যদি প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন আনতে পারে—বিশেষ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাস দমন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে—তবেই জনগণের এই বিশাল ম্যান্ডেট সার্থক হবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়, তারা চায় দৃশ্যমান উন্নয়ন ও নিরাপত্তা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *